হোম নাগরিক উত্তরাঞ্চলের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ নাটোরের লালপুরে

উত্তরাঞ্চলের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ নাটোরের লালপুরে

প্রতিবেদক mahjuja islam
0 মন্তব্য

মাহ্জুজা ইসলাম

মহান মুক্তিযুদ্ধে লালপুর উপজেলায় ২৫ মার্চ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত নানা ঘটনায় লালপুরবাসীর জীবনে বিভিন্ন সময়ে যেমন নেমে এসেছে অমানিশার অন্ধকার আবার তেমনি বিজয়ের আলো ছড়িয়েছে সারাদেশে।

উত্তরঅঞ্চলের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ লালপুর অঞ্চলে হয়েছিল। ময়নার যুদ্ধ, সুগার মিল, গোপালপুর বাজার সহ লালপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা, গন মানুষের প্রতিরোধ, সবই এ অঞ্চলের গৌরব গাঁথা। স্বজন হারানোর বেদনা সাময়িকভাবে প্রশমিত হয়েছে পাকহানাদার বাহিনীর ২৫ রেজিমেন্ট ধ্বংসের মধ্য দিয়ে।

 

সুশীল কুমার পাল (পালবাবু ),  সৈয়দ আকতার হোসেন (আকতার মিয়া), আব্দুল গাফ্ফার খান প্রমুখ এর সহযোগিতায় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের বুলড্রজার বের করে বুলড্রজার চালক একেএম সামসুদ্দীনসহ অন্যান্যরা গিয়ে ঈশ্বরদী বিমান বন্দরের রানওয়ের উপর বুলড্রোজার দিয়ে খালখন্দ কেটে ব্যবহার অনুপযোগি করেন।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ নাটোরের লালপুর উপজেলার রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ময়না গ্রামে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে মুক্তিপাগল জনতা, ইপিআর ও আনসার বাহিনীর হাতে পাক হানাদার বাহিনীর ২৫ রেজিমেন্ট ধ্বংস হয়ে যায়। সেদিন প্রায় ৩৫ জন মুক্তিকামী জনতা ও ৩২জন আহত হন। ঐদিনেই পাক সেনাদের ছোড়া একটি শেলে চামটিয়া গ্রামে ৩ জন শহিদ হন। ময়না গ্রামের এই যুদ্ধ ‘ময়না যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর পরাজয় ঘটলেও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। শহীদদের কয়েকজন হলেন- সৈয়দ আলী মোল্লা, আবুল কাশেম মোল্লা, আয়েজ উদ্দীন মোল্লা, খন্দকার নুরুন্নবী মন্টু, কেরামত আলী শেখ, খায়রুল আনাম ( সাত্তার ) , বঙ সরদার, কমর আলী, আবেদ আলী, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল কুদ্দুস, কালু মিয়া, সেকেন্দার আলী, আছের উদ্দীন, আব্দুল গফুর, জয়নাল আবেদিন ও চেরু প্রামানিক।

পরদিন ৩১ মার্চ ১৯৭১ সকালে ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা হানাদার বাহিনরি সদস্যসহ তাদের নেতৃত্বদানকারী মেজর আসলাম হোসেন খান ওরফে রাজা খান ধরা পড়লে লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল হাই স্কুল মাঠে আনা হয়। সেখানে হামিদুল হক (পোড়াবাবু ) তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

১২ এপ্রিল ধানাইদহ ব্রিজের নিকটে প্রতিরোধ যুদ্ধে ১০/১২ জন শহিদ হন। ১৭ এপ্রিল দুয়ারিয়া ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮ জনকে হত্যা করে । ৫ মে পাকহানাদার বাহিনী নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল, গোপালপুর বাজার এবং গোপালপুর-লালপুর রাস্তায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে মিলের প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিম, মিলের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, শ্রমিক-কর্মচারীসহ অর্ধ-শতাধিক বাঙালি শহিদ হন।

২৯ মে চংধুপইলের পয়তারপাড়া গ্রামে নদীর পাড়ে ধরে এনে ৫০ জনেরও অধিক নিরীহ লোককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০ জুলাই রামকৃষ্ণপুর গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও ৫ জনকে হত্যা করা হয়। ২৫ জুলাই ২২জন মুক্তিযোদ্ধাকে লালপুর নীলকুঠির নিকটে হত্যা করা হয়। ২৬ জুলাই একই স্থানে ৪ জনকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই বিলমাড়িয়া হাট ঘেরাও করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে ৫০ জনেরও অধিক লোককে হত্যা করে। ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাব পুলিশ ও খানসেনারা থানা ত্যাগ করে। ৯ ডিসেম্বর অধিকাংশ রাজাকারও থানা ত্যাগ করে।

১০ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী থানা দখল করে। কিন্তু হঠাৎ ১৩ ডিসেম্বর বর্বর খানসেনারা মহেশপুর গ্রামে ৩৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে পালিযে যায়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন সময়ে পাক হানাদার বাহিনীরা বাওড়া গ্রামে ২১৮ নম্বর রেলওয়ে ব্রিজে মুক্তিযোদ্ধা ওসাধারণ মানুষদের ধরে এনে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাক বাহিনীকে পরাজিত করে লালপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড্ডয়ন করা হয়। প্রতিবছর ১৩ ডিসেম্বর নাটোরের লালপুরে মুক্তি দিবস পালন করা হয়।

১৯৭১ সালে ৩০ শে মার্চ মেজর খাদেম হোসেন রাজার নেতৃত্বে ২৫ রেজিমেন্ট পাকিস্তানী সৈন্য নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে গিয়ে চন্দনা নদী, ছোট ইছামতি ও খলিসাডাঙা নদীর মিলিত স্থানে ময়না গ্রামে অবরুদ্ধ এবং পরস্থ হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এটাই প্রথম বিজয়। এটা ছিল প্রতিরোধ যুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সারা দেশের উৎপাদন যন্ত্র অচল থাকলেও হানাদার বাহিনীর নাটোর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর শেরওয়ানীর আশ্বাসে এলাকার আখ-নির্ভর অর্থনীতি ও আখচাষীদের স্বার্থ বিবেচনা করে নর্ত বেঙ্গর সুগার মিলের তৎকালিন প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যথারীতি মিলের উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হানাদার মেজর তার ওয়াদার বরখেলাপ করেন। মে বেলা ১১টার দিকে অবাঙ্গালীদের (বিহারী) সহযোগিতায় বর্বর পাক বাহিনী নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের সবগুলো গেটে তালা লাগিয়ে মিলের বিভিন্ন অফিস ও কর্মক্ষেত্র থেকে অর্ধ-শতাধিক কর্মকর্তা, শ্রমিক-কর্মচারীকে ধরে এনে মিলের ১নম্বর গেট সংলগ্ন পুকুর ঘাটে ( তৎকালীন গোপাল সাগর ) সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

নর-ঘাতকদের ঐ পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে যারা আত্মহুতি দিয়েছিলেন তারা হলেন- লে. আনোয়ারুল আজিম, শহিদুল্লাহ, সাইফুদ্দিন, সৈয়দ আব্দুল রউফ, গোলজার হোসেন, আবুল হোসেন, খন্দকার আব্দুল মান্নান, গোলাম কিবরিয়া, নূরুল হক, আজাহার আলী, মকবুল হোসেন, আবুল বাসার খান, আজিজুর রহমান, মনসুর রহমান,সাজেদুর রহমান, খন্দকার ইসলাম হোসেন, হাবিবুর রহমান, মোসাদ্দরুল হক, মোকসেদুল আলম, আব্দুল রহমান, মোহাম্মদ আলী-১, মোহাম্মদ আলী-২, আব্দুল মান্নান তালুকদার, মোজম্মেল হক, ফিরোজ মিয়া, আকতার উদ্দিন, সোহরাব আলী, আব্দুল মজিদ, আনোয়ারুর ইসলাম, পরেশ উল্লাহ, সামসুল হুদা, কামাল উদ্দিন, আবুল কাশেম, আব্দুর রব, আবুল কালাম, আব্দুল রাজ্জাক-১, আব্দুল রাজ্জাক-২, নজরুল ইসলাম, আয়েজ উদ্দিন, তোফায়েল প্রামাণিক, মসলেম উদ্দিন এবং শহিদুল ইসলাম। এছাড়াও ঐদিন গোপালপুর বাজার এলাকায় বর্বর পাক সেনারা ডা. শাহাদত হোসেন, আবুল হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, সাজদার রহমান, আশরাফ আলী এবং বকস খলিফা নামে আরও ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

সেদিন তাদের সকলকে নির্বিচারে হত্যা করে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। যে পুকুরে শহীদদের সলিল সমাধি হয়েছিল তার নামকরণ করা হয়েছে “শহীদ সাগর”। এটা পৃথিবীর একমাত্র শহীদ সাগর। শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহীদ সাগর চত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহীদ স্মৃতি যাদুঘর।

গোপালপুর রেলওয়ে স্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে আজিমনগর। ১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গৌরবদীপ্ত ভ’মিকা রাখার জন্য ভাষাসৈনিক নর্থ বেক্সগল সুগার মিলের তৎকালীন প্রশাসক শহীদ লে. আনোয়ারুল আজিমের উদ্দেশ্যে একুশে উদ্যাপন পরিষধ, নওগার পক্ষ থেকে “মরণোত্তর সম্মাননায়” ভ’ষিত করা হয়। প্রতিবছর এই দিনে শহীদ পরিবারের সদস্যরাসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সমাবেত হন “শহীদ সাগর” চত্বরে।

লালপুর উপজেলার ময়না যুদ্ধে ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের শহীদ সাগরসহ অন্যান্য স্থানে শহীদদের পরিবার পরিজন শহীদদের ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানান।

শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলেন, ময়না যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর পরাজয় ঘটলেও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বীরত্বগাঁথার কোনো মূল্যায়ন নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শহীদ পরিবারের অনেকেই এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অপরদিকে ৫ মে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের শহীদ সাগরে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাদের পরিবারের লোকজন প্রতি বছর ৫ মে শহীদ সাগর প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে সমস্বরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতির দাবি জানান। কিন্তু সে দাবি দাবিই থেকে গেছে।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পর বাঁশবাড়িয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী এবং গোপালপুর বিরোপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) আকবর আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাওড়া গ্রামের ২১৮ নম্বর রেলওয়ে ব্রিজ বদ্ধভ’মিতে শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ২৫ মার্চ ২০১৩ নাটোরের মহিলা সংসদ সদস্য শেফালী মমতাজ এই কাজের উদ্বোধন করে। ৬৫ হাজার টাকা ব্যায়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের আংশিক কাজ শেষ করার পর ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে সুবেদার (অব.) আকবর আলী তার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

লালপুর উপজেলার গৌরবের ইতিহাস যতখানি আছে, সেভাবে এ অঞ্চলের ইতিহাস ধরে রাখতে জোরালো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। ইতিহাসের যে সকল বরপুত্র গণ যুদ্ধ করেছেন তাঁরা আস্তে আস্তে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন। আর কয়েক বছরের মধ্যে তাঁরাও আর থাকবেন না। এ অঞ্চলের গৌরবের ইতিহাস তাদের সাথেই মাটির গভিরে মিশে যাবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমাদের দেশ , এ অঞ্চলের ইতিহাস পৌছে দিতে মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর অথবা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ লাইব্রেরী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ শালা স্থাপন করা আবশ্যক।

মাহ্জুজা ইসলাম (স্কুল অ্যাম্বাসেডর,নাটোর)
তথ্যসূত্র: নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস হাই স্কুল কর্তৃপক্ষ

সম্পর্কিত আরও খবর

আপনার মতামত দিন