হোম শিক্ষা নাটরের সুপ্রাচীন বিদ্যাপীঠ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ হাই স্কুল

নাটরের সুপ্রাচীন বিদ্যাপীঠ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ হাই স্কুল

প্রতিবেদক Juboraj Faisal
0 মন্তব্য

মাহ্জুজা ইসলাম: উত্তরাঞ্চলীয় বাসভবন ‘উত্তরা গণভবন’ চলনবিল, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন আর কাঁচাগোল্লা খ্যাত নাটোর অঞ্চল যুগ যুগ ধরেই মুখরিত হয়েছে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণি, সৃজনশীল ব্যাক্তির পদচারণায়। অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানীর স্মৃতি বিজড়িত, প্রাচীন ঐতিহ্য ও রাজ-রাজন্যের ঐশ্বর্যমন্ডিত নাটোর-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুপ্রাচীন বিদ্যাপীঠ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ হাই স্কুল। গোপালপুর সুমিষ্ঠ আখকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ কর্তৃক পরিচালিত স্বনামধন্য এই বিদ্যালয়টি তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এ অঞ্চলে সাফল্যের সাথে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।

উত্তর জনপদের পদ্মা নদী বিধৌত লালপুর উপজেলার গোপালপুরে ১৯৩৩ খ্রিষ্ঠাব্দে কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। অবিভক্ত ভারত-বর্ষে তৎকালীন সময়ে ব্যবসা-সহ শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে মাড়োয়ারীদের একচ্ছত্র আধিপত্ত ছিল। এই সুগার মিলটি প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাড়োয়ারী শিল্পমালিক দুই ভাই সুরুজমল ও নাগরমল আগরওয়ালা। সুগার মিলটিতে মাড়োয়ারীসহ যেসব কর্মকতা, কর্মচারী ও শ্রমিকগণ কর্মরত ছিলেন তাদের প্রায় সকলেই এলাকার বাইরের। স্থানীয় জনসাধারণের মিলের চাকুরির প্রতি তেমন আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল না।

এ সময় পরিবার নিয়ে যারা সুগার মিলে কর্মরত ছিলেন, সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে তাদের মাঝে তাগিদ অনুভ’ত হয়। মাড়োয়ারী তাদের সন্তানরা হিন্দি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হলেও বাংলাভাষা লোকজন গভীরভাবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার তাগিদ অনুভব করায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির জোর দাবি করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সাল থেকে প্রাইমারী স্কুলের কার্যক্রমের মাধ্যমে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১৯৪৫ থেকে ১৯৬৬ ছোট পরিসরে থাকলেও ১৯৬৭ সালে ৩.৪৮ একর ভূমির উপর নির্মিত বিদ্যালয়ের বর্তমান আঙ্গিক সুবিশাল ভবন ও মাঠ নিয়ে নবযাত্রা শুরু করে। প্রথমে বিদ্যলয়টির নাম ছিল উত্তর বঙ্গ চিনি কল উচ্চ বিদ্যালয় পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে নর্থ বেঙ্গর সুগার মিলস্ হাই স্কুল রাখা হয়।

প্রথম অবস্থাতে স্কুলটি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত থাকলেও ১৯৬৮ সালে বোর্ডের রিকগনিশন পেয়ে একে একে নবম এবং দশম শ্রেণি খোলা হয় এবং ১৯৭০ সালে ছাত্রছাত্রী স্কুল থেকে প্রথম এসএসসি পরিক্ষা দিতে সক্ষম হয়। বিদ্যালয়টিতে মোট ২২জন (১০ জন চুক্তি) শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মরত আছে। মোট ২৩টি কক্ষ রয়েছে।

২০১৮ সালে মোট ৮৮জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে । জিপিয়ে-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮জন। পাসের হার ৯৫.৪৫% । ২০১৯ সালে মোট ১০২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে । জিপিয়ে-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩ জন। পাসের হার ৯৬.০৮% । ২০২০ সালে মোট ১০২জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে । জিপিয়ে-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩ জন। পাসের হার ৯৬.০৮%।

পুরোনো ভিত্তির উপর আধুনিকায়নের ছোঁয়া বিদ্যালয়ের অবকাঠামোকে করেছে সমুন্নত Digital Attendance এর মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করেছে Multimedia Classroom- G, CCTV- এর মাধ্যমে নিবিড় মনিটরিং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে গতিশীলতা দান করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের বিশ্বিনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বিদ্যালয়ে স্থাপিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব-এর মাধ্যমে তথ্য ও প্রযুক্তি জ্ঞানে কৈশোর থেকেই উৎকর্ষতা লাভ করেছে শিক্ষার্থীরা।

উন্নত জীবনবোধ গড়ার প্রত্যয়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিশীলিত মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে গড়ার কার্যক্রমকে নিরন্তরভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সততা স্টোর ও লাইব্রেরির বই দিচ্ছে দৃঢ় চরিত্র। বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলার গৌরবময় ঐতিহ্যের আলোয় বর্তমান প্রজন্মকে স্বাস্থ্যবান ও বলবানরূপে গড়ে তোলার প্রচেষ্ঠা অবাহত রয়েছে। বিদ্যালয়টির অনলাইন পর্টাল রয়েছে ANBSMHS.Edu.gov.bd এখানে বিদ্যালয়টি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য রয়েছে।

বিশ্বয়ানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, ‘রূপকল্প ২০৪১’ সফল বাস্তবায়নের জন্য আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস হাই স্কুল অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের জন্য প্রতি চারবছর পর পর ‘সতদল’ নামে সরণীকা প্রকাশিত হয়।

এছাড়া গত ৭৫ বছরে এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে এ স্কুলটির জুরি মেলা ভার। ২০১৯ খ্রিষ্ঠাব্দ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিরস হাই স্কুল বেশ জাকজমক ভাবে ৭৫তম বর্ষপুর্তি উৎযাপন করেছে। পঁচাত্তর বছর অতিক্রম করে সগৌরবে শিক্ষার আলো বিতরণ করে সু-নাগরিক তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছে এবং গাণিতিক হারে বাহির হলেও তার আলো ছড়াচ্ছে জ্যামিতিক হারে। দেশে-বিদেশের প্রতিটি সেক্টরে এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছে। সু-দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সফল এ বিদ্যালয়টি।

এটি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান নয় এটি স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু ইতিহাসের সাক্ষী। তখন স্বাধীকার আন্দোলন চলছে, স্কুলের প্রবেশদ্বারের পাশে শিমুল গাছের তলা থেকে লালপুর থানার ছাত্রলীগরে প্রথম মিছিল বের হয় তৎকালীন ছাত্রনেতা শহীদ সৈয়দ আনসার হোসেনের নেতৃত্বে।

১৯৬৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী লালপুর থানায় প্রথম প্রভাতফেরী বের হয় ভোর ৫.৩০ মিনিটে স্কুলের ঐ শিমুল গাছের পাদদেশ থেকে। প্রভাতফেরীর নেতৃত্বে ছিলেন স্বর্গীয় সুশীল পাল (শ্রমিক নেতা, যিনি আই.এল.ও. সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতেন) শহীদ সৈয়দ আনসার হোসেন, স্বপন ভদ্র ও মরহুম আবু হেলাল।

শহীদ সৈয়দ আনসার হোসেনের পস্তাবে শিমুল গাছটির পাশে ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পূর্বে সামান্য যে কয়টি শহীদ মিনার নির্মিত হয় এটি তার মধ্যে একটি সংবাদ পত্রের জরিপে এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে পাকবাহিনীর রষানলে ১৯৭০ সালে বুলডোজার দিয়ে শহিদ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী ২৩শে মার্চ শহিদ মিনারে লালপুর থানায় বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন শহিদ সৈয়দ আনসার হোসেন।

বিদ্যালয়টি যাবতীয় বিষয়বস্তু দ্বারা সয়ংসম্পর্ণ হলেও মিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া কষ্টসাধ্য হওয়ায় প্রায় ৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। উপরস্ত কর্মকতাদের ততপরতায় বিদ্যালটিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক প্রদান করা হলে বিদ্যালটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলাদেশ গড়ার যগ্য কর্ণধার তৈরি করতে সক্ষম হবে।

মাহ্জুজা ইসলাম, স্কুল অ্যাম্বাসেডর

নাটোর জেলা

 

সম্পর্কিত আরও খবর

আপনার মতামত দিন