হোম মতামত রাণী সারদা সুন্দরী স্মৃতির আলো যে বিদ্যাপীঠ

রাণী সারদা সুন্দরী স্মৃতির আলো যে বিদ্যাপীঠ

প্রতিবেদক Juboraj Faisal
0 মন্তব্য

### মাহ্জুজা ইসলাম (স্কুল অ্যাম্বাসেডর) ###

আজ থেকে প্রায় সার্ধশতবর্ষ পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে যখন দেশে শিক্ষার খুব অভাব ছিল। ঠিক সেই সময়ে রাণী সারদা সুন্দরী দেবীর আর্শীবাদে দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ বাংলাদেশের সাবেক রাজশাহী জেলা বর্তমানে নাটোর জেলার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত প্রমওা পদ্মা নদীর উওরপাড়ে তৎকালীন লালপুরের সাধারণ জনগণের সগযোগিতায় গড়ে উঠেছিল লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।

উত্তর বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লালপুর শ্রী সুন্দরী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় পুঠিয়া পাঁচআনি রাজ স্ট্রেটের রাণী শরৎ সুন্দরী ১৮৬৭ সনে নিজ নামে লালপুরে “মধ্য ইংরেজী” (এম.ই) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

পুঠিয়া রাজ সরকার বিদ্যালয়টিকে আর্থিক অনুদান না দেওয়ায় ১৯৩১ সাল হতে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ ৫ বৎসর বন্ধ থাকে। ১৯৩৬ সালে বুধপাড়ার জমিদার শ্রীযুক্ত বাবু যতীন্দ্রনাথ কুন্ডু ও শ্রীযুক্ত বাবু দেবেন্দ্রনাথ কুন্ডু ভ্রাতৃদ্বয়ের অনুদানে একটি গৃহ ও কিছু আসবাবপএ দেওয়ায় তাঁদের স্বর্গীয় পিতা চন্দ্রনাথ কুন্ডুর স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত হয়ে বিদ্যালয়টি “চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়”  নামে পরিচালিত হতে থাকে। যা ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে ২৫ জন ছাএ নিয়ে নতুনভাবে যাএা শুরু করে।

পরবর্তীতে জমিদার বাবু দেবেন্দ্রনাথ কুন্ডুর সহায়তায় ১৯৪১ সনে উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিনেট সভায় মুঞ্জরী প্রাপ্ত হলে তাঁর নিঃসন্তান সহধর্মিনী শ্রীমতি শ্রী সুন্দরীর নামে বর্তমান এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় ‘লালপুর  শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’।

১৯৪৬ সালে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। সর্বোপরি ১৯৭৬ সালে পাইলট প্রকল্পভূক্ত এবং ২০১২ সালে মডেল প্রকল্পভূক্ত হওয়ায় নামকরণ হয় ‘ লালপুর  শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’।

অনেক দূর দূরান্ত হতে সাইকেল অথবা পায়ে হেঁটে ছেলেরা পড়তে আসত। এলাকার বাইরের ছেলেদের থাকার জন্য একটি বোর্ডিং-এর ব্যবস্থাও ছিল। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি(ভকেশনাল)  শাখা এবং ২০০১ সালে এইচএসসি (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা- বিএম) শিক্ষাক্রম অনুমোদন ও এমপিভুক্ত হয়।

ফলাফলের দিক থেকেও বিদ্যালয়টি পিছিয়ে নেই। জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলঃ ২০১৭ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২২৪ জন, পাস করেছে ২২২ জন, পাসের হার ৯৩.২৪ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ২৮ জন। ২০১৮ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ২৫৭ জন, পাস করেছে ২৫০ জন, পাসের হার ৯৭.১৯ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ২০ জন।

২০১৯ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ২৪২ জন, পাস করেছে ২২৬ জন, পাসের হার ৯৩.৩৯ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ১৮ জন। এসএসি পরীক্ষার ফলাফলঃ ২০১৮ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ১১৩ জন, পাস করেছে ৭৯ জন, পাসের হার ৭০.৪০ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ১২ জন।

২০১৯ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ১৭১ জন, পাস করেছে ১৬৭ জন, পাসের হার ৯৭.৬৬ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ২১ জন। ২০২০ সালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ১০৬ জন, পাস করেছে ১০৪ জন, পাসের হার ৯৮.১১ শতাংশ, জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ২৫ জন।

এই বিদ্যালয় হতে অজস্র শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সুনামের সাথে সমাজ তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- আব্দুর রহমান (ব্যাচ-১৯৬২), সাবেক অধ্যাপক,রাজশাহী কলেজ. এ্যাডভোকেট মুক্তার হোসেন (ব্যাচ- ১৯৮৫), জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, নাটোর জজর্কোট ও নাটোর জেলা প্রতিনিধি. আলমগীর কবির পরাগ (ব্যাচ-১৯৮৮), পুলিশ সুপার, রাঙ্গামাটি. এম.এ.মোক্তার হোসেন (ব্যাচ- ১৯৮৬), সিনিয়র টিচার, সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ঢাকা. এ.টি.এম শরিফুল ইসলাম রুবেল (ব্যাচ-১৯৯০) সিনিয়র রির্পোটার,ক্রিয়া জগৎ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ঢাকা.

শিক্ষার পাশাপাশি শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জাতীয় দিবস উদযাপন  বিদ্যায়ের নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে “ফুটবল খ্যাত” লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় খেলাধুলায় অত্যন্ত পারদর্শী।

উপজেলা থেকে জেলা হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে ফুটবলে পারদর্শিতার স্মারক হিসেবে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। যা গোটা লালপুরবাসীর জন্য গৌরব ও অহংকারের বিষয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে লালপুর  শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় তার “জৌলুস” হারাতে বসেছে।

২০১৩ সালে স্কুলের প্রতিষ্ঠার ১৪৬ বছরে উদ্যোগ নেওয়া হয় ‘শতবর্ষ’ উৎযাপণ প্রস্তুতি। বিশেষ করণে তা স্থগিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানের ১৫২ বছরে ‘সার্ধশতবর্ষ’ উৎসব উদযাপিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উৎযাপন উপলক্ষে সরকার ঘোষিত ‘মুজিব বর্ষ ২০২০’ এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই বিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষ উৎসব উৎসর্গ করা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে।

সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম এর পিতা মরহুম নুরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পাকসেনাদের হাতে শহীদ হন।

লালপুর  শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬২ জন শিক্ষার্থী, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

এই স্কুলের ছাত্র আলমগীর কবির পরাগ (পুলিশ সুপার, রাঙ্গামাটি) এর পিতা মরহুম আদম আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যাঁদের অবদানে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। তাঁদের অবদানের প্রতি গভীর সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে বিদ্যালয় চত্ত্বরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক স্থাপন করা হয়েছে। যা জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা ২০২০ খ্রি. ১১ জানুয়ারি শনিবার সার্ধশতবর্ষ উৎসবে উদ্বোধন করেন।

বিদ্যালয়টির খেলাধুলা বিশেষকরে ফুটবলে দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বর্ষাকালে খেলার মাঠটি  প্রায় ৩/৪ মাস কাদা পানিতে একাকার হয়ে থাকে। স্কুলের নেই কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ফলে প্রতিনিয়ত স্কুল তার জৌলুস হারাচ্ছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হল অতি প্রাচীন একটি স্কুলের এত আনুসঙ্গিক সুযোগ সুবিধা এবং সুনাম সুখ্যাতি থাকা সত্বেও কেন বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলো না, যা লালপুরবাসীর জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা। পরিশেষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে স্থানীয়     জনসাধারণ, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের একমাত্র আবেদন, লালপুর শ্রী সুন্দরী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করা হোক।

লেখক: মাহ্জুজা ইসলাম

এসএসসি পরীক্ষার্থী, স্কুল অ্যাম্বাসেডর, নতুন সূর্যোদয়

সম্পর্কিত আরও খবর

আপনার মতামত দিন